Friday, March 13, 2026

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া: এক আলোকবর্তিকার জীবনগাথা

Posted by ভদন্ত সুবর্ণ থের on March 13, 2026 with No comments

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া: এক আলোকবর্তিকার জীবনগাথা 

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া

বাংলাদেশের শিক্ষা, গবেষণা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির ইতিহাসে অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়ার নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্ত। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি জ্ঞানচর্চা, মানবিক মূল্যবোধ, বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। একজন শিক্ষক, গবেষক, সংগঠক এবং সমাজমনস্ক চিন্তাবিদ হিসেবে তার জীবন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়; বরং এটি এক অনুপ্রেরণার আলোকগাথা।

জন্ম ও শৈশব: এক সাধারণ গ্রামের অসাধারণ সন্তান

ড. সুকোমল বড়ুয়া ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা গণেশ চন্দ্র বড়ুয়া এবং মাতা বুদ্ধিমতী বড়ুয়া। শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ নিয়ে বেড়ে ওঠেন।

গ্রামের শান্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই কিশোরের চোখে ছিল জ্ঞান অর্জনের স্বপ্ন—যে স্বপ্ন একদিন তাকে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাবিদে পরিণত করবে।

 

শিক্ষা ও শিক্ষকতার পথচলা

ড. সুকোমল বড়ুয়ার শিক্ষকতা জীবন শুরু হয় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া কলেজে প্রভাষক হিসেবে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ একাডেমিক যাত্রা। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে এই বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীকে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার গবেষণা, বক্তৃতা এবং লেখালেখি দেশের বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আরো পড়ুন- করুণা ও মানবতার আলোকবর্তিকা: জ্ঞানশ্রী মহাথেরের ত্যাগময় জীবন

প্রতিষ্ঠান নির্মাতা ও সমাজসংগঠক

ড. সুকোমল বড়ুয়া শুধু একজন শিক্ষকই নন, তিনি একজন প্রতিষ্ঠান নির্মাতাও। তিনি হাসিনা জামাল ডিগ্রি কলেজ এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল বুদ্ধিস্ট মনাস্ট্রি-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তিনি শিক্ষা, ধর্মীয় চর্চা এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। এছাড়াও তিনি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট-এর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে তিনি সেন্টার ফর বুড্ডিস্ট হেরিটেজ অ্যান্ড কালচার-এর পরিচালক হিসেবে বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির মহাকরুণার দূত

ড. সুকোমল বড়ুয়ার কর্মকাণ্ড শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক পরিসরেও তিনি পরিচিত এক নাম। তিনি রিলিজিয়নস ফর পিস বাংলাদেশ-এর সভাপতি এবং এশিয়ান কনফারেন্স অফ রিলিজিয়নস ফর পিস (ACRP)-এর নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ আন্তঃধর্মীয় লেখক ও সাংবাদিক ফোরাম-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

 

সংগ্রাম, সাধনা এবং স্বীকৃতির গল্প

দীর্ঘ শিক্ষকতা, গবেষণা এবং সমাজসেবার পথ সহজ ছিল না। কিন্তু নিরলস অধ্যবসায়, মানবিক আদর্শ এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি অগাধ ভালোবাসা তাকে ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতির দিকে নিয়ে যায়।

 

একুশে পদক (২০০৬)

শিক্ষা ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০০৬ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক প্রদান করে। 

 

স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২৬)

২০২৬ সালে তার দীর্ঘ সাধনা ও অবদানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করার ঘোষণা দেয়। তাকে “গবেষণা ও প্রশিক্ষণ” বিভাগে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। এই পুরস্কার শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়; এটি তার চার দশকের বেশি সময়ের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, শিক্ষা বিস্তার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির নিরলস সাধনার স্বীকৃতি। স্বাধীনতার মাস মার্চে এই সম্মাননা তার জীবনের এক আবেগঘন মুহূর্ত—যেখানে এক গ্রামীণ কিশোরের স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং আত্মত্যাগের দীর্ঘ পথচলা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বীকৃতি লাভ করে।

 

স্বর্ণপদক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে “অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া স্বর্ণপদক” চালু করা হয়েছে। পালি ও বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের সর্বোচ্চ নম্বরধারী শিক্ষার্থীকে এই পদক প্রদান করা হয়। এটি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।

 

এক আলোকিত জীবনের শিক্ষা

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়ার জীবন আমাদের শেখায়— একটি ছোট গ্রাম থেকেও বিশ্বমানের জ্ঞানচর্চার পথ তৈরি করা যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে শিক্ষা শুধু পেশা নয়, এটি মানবতার সেবা করার এক মহান পথ। তার জীবন সংগ্রাম, জ্ঞানচর্চা এবং মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে। 

 

— ভদন্ত: সুবর্ণ থের, বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহার, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি। 

 

#mahakoruna

#subornathero

#mahakoruna,blogspot.com

#মহাকরুণা

#সুবর্ণথের

#বাইন্যাছোলা 

0 comments:

Post a Comment