কীর্তিমানের মৃত্যু নেই : ভদন্ত উ সুমনা মহাথের ভান্তের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি
![]() |
ভদন্ত উ সুমনা মহাথের
|
মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার বয়স বা আয়ুষ্কালে নয়, বরং তার কর্মে। যে মানুষ নিজের স্বার্থ ভুলে সমাজের জন্য কাজ করেন, অন্যের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেন, তারা মৃত্যুর পরেও মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও স্মৃতির ভাণ্ডারে অম্লান হয়ে থাকেন। তাদের কর্ম মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, তাদের ত্যাগ পথ দেখায় নতুন প্রজন্মকে। তাই বলা হয়—কীর্তিমান মানুষের মৃত্যু নেই; তারা কর্মের মধ্য দিয়েই অমরত্ব লাভ করেন।
আজ আমরা গভীর শোক ও বেদনাভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্মরণ করছি এমনই এক মহৎ ব্যক্তিত্বকে—পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বাংলাদেশ এর বিনয় অধিকরণ বোর্ডের সম্মানিত সভাপতি, বৌদ্ধ শিশুঘর এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, বৌদ্ধ কূলগৌরব, বর্ষিয়ান সংঘ পুরোধা এবং অন্যতম সাংঘিক ব্যক্তিত্ব ভদন্ত উ সুমনা মহাথের ভান্তে। তাঁর জৈবিক প্রস্থান আমাদের হৃদয়কে করেছে গভীরভাবে শোকাহত, কিন্তু তাঁর কর্ম ও আদর্শ চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায় এবং অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।
আরো পড়ুন- অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া: এক আলোকবর্তিকার জীবনগাথা
ভদন্ত উ সুমনা মহাথের ভান্তে ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন ধর্ম, মানবতা এবং সমাজকল্যাণের জন্য। তিনি শুধু একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন আলোকবর্তিকা, যিনি অসংখ্য মানুষের জীবনকে আলোকিত করেছেন জ্ঞান, নৈতিকতা এবং মানবিকতার আলোয়। তাঁর জীবন ছিল ত্যাগ, শৃঙ্খলা এবং মহত্ত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত ও অসহায় শিশুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অসীম। সেই ভালোবাসা থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বৌদ্ধ শিশুঘর—যা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অসংখ্য অনাথ ও অসহায় শিশুর জন্য হয়ে উঠেছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সেখানে শিশুরা পেয়েছে শিক্ষা, স্নেহ, নৈতিকতা এবং মানবিকতার পাঠ। একজন পিতার মতো স্নেহে, একজন শিক্ষকের মতো প্রজ্ঞায় এবং একজন পথপ্রদর্শকের মতো দূরদৃষ্টিতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।
একজন সত্যিকারের সংঘনেতা হিসেবে ভদন্ত উ সুমনা মহাথের ভান্তে সবসময় সংঘের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ বাংলাদেশ এর বিনয় অধিকরণ বোর্ডের সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠা, সততা এবং দূরদৃষ্টির সাথে। সংঘের শৃঙ্খলা রক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মীয় আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সরল, বিনয়ী এবং আত্মনিবেদিত। ক্ষমতা বা পদমর্যাদার মোহ তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার পদে নয়, বরং তার চরিত্রে এবং কর্মে। তাই তিনি নিজেকে সবসময় সাধারণ মানুষের কাছে রেখে তাদের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
ভদন্ত উ সুমনা মহাথের ভান্তের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অগাধ মমত্ববোধ এবং সহমর্মিতা। তিনি ছিলেন মানুষের দুঃখের সঙ্গী, বিপদের বন্ধু এবং হতাশ মানুষের মহাকরুণার আশার আলো। তাঁর কাছে যে কেউ সাহায্যের জন্য এলে তিনি কখনো নিরাশ করেননি। নিজের সীমিত সামর্থ্য নিয়েও তিনি চেষ্টা করেছেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
আজ তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি আমাদের হৃদয়ে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তাঁর কণ্ঠের সেই শান্ত উপদেশ, তাঁর স্নেহময় দৃষ্টি, তাঁর মমতায় ভরা মহাকরুণার আচরণ—সবকিছু আজ স্মৃতির পাতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি তিনি চলে গেছেন? না, তিনি চলে যাননি। তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কর্মে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে, তাঁর আদর্শে এবং তাঁর দ্বারা আলোকিত অসংখ্য মানুষের জীবনে।
যে শিশুগুলো তাঁর স্নেহে বড় হয়েছে, যে মানুষগুলো তাঁর কাছ থেকে নৈতিকতার শিক্ষা পেয়েছে, যে সংঘ তাঁর নেতৃত্বে পথ চলেছে—তাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে তিনি আজও জীবন্ত। তাঁর শিক্ষা, তাঁর উপদেশ এবং তাঁর আদর্শ যুগের পর যুগ ধরে পথ দেখাবে অসংখ্য মানুষকে।
মৃত্যু মানুষকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু মহান মানুষের আদর্শকে কখনো মুছে ফেলতে পারে না। সময় যতই এগিয়ে যাবে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠবে ভদন্ত উ সুমনা মহাথের ভান্তের কর্মের মাহাত্ম্য। তিনি ছিলেন সত্যিই একজন কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব—যার কর্ম সমাজকে আলোকিত করেছে এবং মানুষের হৃদয়ে সৃষ্টি করেছে অমলিন শ্রদ্ধা।
আজ আমরা তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁর ত্যাগ, তাঁর অবদান এবং তাঁর মানবিকতা আমাদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। আমরা প্রার্থনা করি—তিনি যেন নির্বাণের পথে শান্তি লাভ করেন এবং তাঁর মহৎ আদর্শ আমাদের পথচলায় চিরকাল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকে।
শেষে আবারও সেই সত্য কথাটি মনে পড়ে—
কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।
ভদন্ত উ সুমনা মহাথের ভান্তে দেহে নেই, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কর্মে, তাঁর আদর্শে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত মানবকল্যাণের কর্মযজ্ঞে। ইতিহাসের পাতা যতদিন থাকবে, মানুষের হৃদয়ে মানবতার আলো যতদিন জ্বলবে—ততদিন তাঁর নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে।
তাঁর প্রতি জানাই বিনম্র প্রণাম এবং অশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
তিনি আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর আলোকিত পথচলা আমাদের অনুপ্রাণিত করবে যুগের পর যুগ।
— ভদন্ত: সুবর্ণ থের, বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহার।


0 comments:
Post a Comment