Thursday, March 12, 2026

ধর্মপাল থের: ত্যাগ, বেদনা ও অদম্য সাধনায় গড়ে ওঠা এক পুণ্যভূমির গল্প

Posted by ভদন্ত সুবর্ণ থের on March 12, 2026 with No comments

ধর্মপাল থের: ত্যাগ, বেদনা ও অদম্য সাধনায় গড়ে ওঠা এক পুণ্যভূমির গল্প

ভদন্ত ধর্মপাল থের

খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ির এক পাহাড়ি গ্রাম—দৌজড়ি পাড়া। আজ যে স্থানটি অনেকের কাছে ধর্মচর্চা, মানবতা এবং শান্তির এক পবিত্র কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেই জায়গাটি একসময় ছিল নীরব, অবহেলিত এবং ধর্মীয় চর্চা থেকে অনেকটাই দূরে। পাহাড়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই গ্রামটিকে ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছেন একজন মানুষ—  ধর্মপাল থের ।     তিনি শুধু একজন ভিক্ষু নন; তিনি এক  নীরব সাধক, এক স্বপ্নদ্রষ্টা, এক ত্যাগী মানুষ, যিনি নিজের জীবনকে মানুষের কল্যাণ আর ধর্মের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য উৎসর্গ করেছেন।


 ধর্মপাল থের বর্তমানে দৌজড়ি পাড়া আদর্শ বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ও পরিচালক। কিন্তু এই পরিচয়টির পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত দুঃখ, সংগ্রাম, ত্যাগ আর অশ্রুভেজা স্মৃতি। পাহাড়ি এই জনপদে ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করা কোনো সহজ কাজ ছিল না। চারপাশে দারিদ্র্য, সীমিত সুযোগ, মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম—সবকিছুর মাঝেও তিনি বিশ্বাস করতেন, যদি মানুষের মনে ধর্মের আলো জ্বলে ওঠে, তবে তাদের জীবনও আলোকিত হবে।

 অনেক বছর আগে যখন ধর্মপাল থের প্রথম দৌজড়ি পাড়ায় আসেন, তখন এই গ্রামটি ছিল অনেকটাই অচেনা ও অনুন্নত। মানুষের জীবনে ধর্মীয় চর্চা খুব একটা ছিল না। অনেকেই জানতেন না ধর্মকর্মের গভীরতা কিংবা মানবতার প্রকৃত শিক্ষা। পাহাড়ি জীবনের কষ্ট  আর অভাবই ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু ধর্মপাল থের সেই  বাস্তবতাকে দেখেও  হতাশ হননি।  বরং তিনি  মনে মনে  প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—এই গ্রাম একদিন ধর্মের আলোয় উজ্জ্বল হবে।


 শুরুটা ছিল খুবই ছোট। হাতে কোনো বড় অর্থ ছিল না, ছিল না বড় কোনো দাতাগণের সহায়তা। কিন্তু ছিল অদম্য বিশ্বাস এবং অসীম ধৈর্য। তিনি মানুষের কাছে গিয়ে কথা বলতেন, ধর্মের কথা বলতেন, মানবতার কথা বলতেন। কখনো ছোট ছোট ধর্মীয় সভা করতেন, কখনো শিশুদের ধর্ম শিক্ষা দিতেন। ধীরে ধীরে মানুষ তাঁর আন্তরিকতা অনুভব করতে শুরু করল।

 তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। অনেক সময় তাঁকে উপহাস করা হয়েছে, অবহেলা করা হয়েছে, এমনকি কখনো কখনো ভুল বোঝাও হয়েছে। অনেকেই ভাবতেন—এই কঠিন জীবনের মধ্যে ধর্মের কথা বললে কি পেট ভরে? কিন্তু ধর্মপাল থের জানতেন, ধর্ম শুধু আচার নয়; ধর্ম মানুষের মনকে শান্ত করে, তাকে ভালো মানুষ হতে শেখায়।

 বহু কষ্ট, পরিশ্রম এবং মানুষের সহযোগিতায় একসময় তিনি শুরু করলেন একটি স্বপ্ন—বুদ্ধের একটি বিশাল প্রতিবিম্ব নির্মাণ করবেন। সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয় ৩০ ফুট উচ্চতার একটি বুদ্ধ প্রতিবিম্ব। পাহাড়ি এলাকায় এমন একটি বুদ্ধ প্রতিবিম্ব প্রতিষ্টা করা সহজ ছিল না। অর্থের অভাব, অভিজ্ঞ  কাজের শ্রমিকের অভাব, পরিবহনের কষ্ট—সবকিছুই ছিল অভাব- অনটনের। কিন্তু তিনি দমে যাননি। 

 প্রতিটি ইট, প্রতিটি পাথর যেন তাঁর ত্যাগের গল্প বলে। অনেক সময় কাজ বন্ধ হয়ে গেছে অর্থের অভাবে। কখনো আবার প্রাকৃতিক বাধা এসে দাঁড়িয়েছে। তবুও ধর্মপাল থেরের দৃঢ় মনোবল কখনো ভেঙে পড়েনি। তিনি বিশ্বাস করতেন—যদি কাজটি মানুষের কল্যাণের জন্য হয়, তবে একদিন না একদিন তা সফল হবেই।

 শুধু একটি নয়, ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে উঠেছে আরও ২৮টি বুদ্ধ প্রতিবিম্ব। প্রতিটি প্রতিবিম্ব যেন মানুষের মনে শান্তি, করুণা এবং সহমর্মিতার বার্তা বহন করে। সেই পাহাড়ি নিস্তব্ধতার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধের মূর্তিগুলো যেন নীরবে বলে—জীবন যতই কঠিন হোক, করুণা ও মানবতা কখনো হারিয়ে যায় না।

এখানেই শেষ নয়। ধর্মপাল থের নির্মাণ করেছেন দাঁড়ানো সিদ্ধার্থ বুদ্ধের একটি অনন্য বুদ্ধ প্রতিবিম্ব। এই প্রতিবিম্ব শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, এটি মানুষের শান্তির প্রতীক। যেন সেই প্রতিবিম্ব সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয়—  আমি শ্রেষ্ঠ,
                                                 আমি জ্যেষ্ঠ,
                                                 আমি সর্বোত্তম।

                                                 এটাই আমার শেষ জন্ম,
                                                 আমার আর পুনর্জন্ম নেই।”

প্রতিটি সফলতার পেছনে যেমন হাজারো দুঃখ, মানসিক যন্ত্রণা, কষ্ট আর বেদন থাকে  তেমনি ধর্মপাল থের’র  জীবনেও আজকের এই সফলতার পেছনে অনেক দুঃখ-কষ্টে ভরা। শত শত মানসিক আঘাত, অপমান এবং কষ্ট তিনি সহ্য করেছেন। অনেক সময় এমনও মুহূর্ত এসেছে, যখন মনে হয়েছে সবকিছু ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ তিনি জানতেন—যদি তিনি থেমে যান, তবে এই গ্রামের মানুষ আবার অন্ধকারেই রয়ে যাবে।

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। তারা বড় অঙ্কের দান-দক্ষিণা দিতে পারেন না। কিন্তু তাদের হৃদয়ের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা অসীম। কেউ শ্রম দিয়ে সাহায্য করেন, কেউ সামান্য সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দেন, কেউ আবার শুধু পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জোগান। এই ছোট ছোট সহযোগিতাই একদিন বড় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

আজ দৌজড়ি পাড়া আর আগের সেই গ্রামটি নেই। আজ এটি এক ধর্মীয় চেতনার মানসিক প্রশান্তির পূণ্যভূমি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে, বুদ্ধের প্রতিবিম্বের সামনে দাঁড়িয়ে শান্তি খোঁজে, প্রার্থনা করে, ধ্যান করে। 

বর্তমানে এখানে নতুন বিহার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধর্মপাল থের চান এই বিহারটি শুধু প্রার্থনার স্থানই হবে না, বরং এটি হবে শিক্ষা, নৈতিকতা এবং মানবিকতার কেন্দ্র। এখানে শিশুদের ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হবে, তরুণদের সঠিক পথ দেখানো হবে, এবং মানুষকে মানবতার মূল্য শেখানো হবে।

আজ প্রতিষ্টিত এই মহান ও পূণ্যকর্মের পেছনে সমতলের বৌদ্ধ ভাইদের  (বড়ুয়া) অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনস্বীকার্য। পাহাড়ের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ধর্মীয় জাগরণ ও উন্নয়নের যে আলোকশিখা আজ জ্বলে উঠেছে, তার পেছনে সমতলের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আন্তরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সহযোগিতা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তারা কখনো এই পাহাড়ি মানুষদের একা মনে করেননি; বরং নিজেদেরই এক অংশ বলে মনে করে সবসময় পাশে দাঁড়িয়েছেন।

যখনই দৌজড়ি পাড়া আদর্শ বৌদ্ধ বিহারের উন্নয়ন বা কোনো ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, তখনই সমতলের বৌদ্ধ ভাইয়েরা সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন। কেউ দিয়েছেন আর্থিক সহায়তা, কেউ আবার দিয়েছেন মূল্যবান পরামর্শ ও নৈতিক সমর্থন। তাদের আন্তরিক উৎসাহ, অনুপ্রেরণা এবং ধর্মের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা এই উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নিতে বিরাট শক্তি জুগিয়েছে।

 তাদের এই সহযোগিতা শুধু দান-দক্ষিণা বা সামান্য সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল ভ্রাতৃত্ব, মৈত্রী ও করুণার এক অনন্য নিদর্শন। সমতলের বৌদ্ধ ভাইয়েরা সবসময় এই বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে এসেছেন যে, পাহাড়ে বসবাসকারী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও মানবিক উন্নয়ন ঘটলে সমগ্র বৌদ্ধ সমাজই শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে। তাই তারা আন্তরিকভাবে চান—পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও ধর্মের আলো ছড়িয়ে পড়ুক, মানুষ ধর্মের পথ চিনুক, এবং মানবতার মূল্যবোধে উজ্জ্বল হয়ে উঠুক।

তাদের এই মহানুভবতা, উদারতা এবং ধর্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ সত্যিই অপরিসীম কৃতজ্ঞতার দাবিদার। পাহাড় ও সমতলের এই বন্ধন কেবল ভৌগোলিক দূরত্বকে অতিক্রম করেনি, বরং এটি প্রমাণ করেছে যে ধর্মের পথ মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে।

আজ দৌজড়ি পাড়ার মানুষ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন সমতলের সেই সকল বৌদ্ধ ভাইদের, যারা নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ধর্মপাল থের নিজেও হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তাদের এই সহযোগিতা ও আশীর্বাদ না থাকলে এত বড় ধর্মীয় উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া অনেক কঠিন হয়ে যেত।

তাই দৌজড়ি পাড়ার মানুষ এবং দৌজড়ি পাড়া আদর্শ বৌদ্ধ বিহার পরিবার আজ আন্তরিক কণ্ঠে বলতে চায়—সমতলের বৌদ্ধ ভাইদের এই মহৎ অবদান কখনো ভোলার নয়। তাদের সহযোগিতা, ভালোবাসা ও ধর্মের প্রতি নিষ্ঠা পাহাড়ের এই ধর্মীয় উন্নয়নযাত্রার ইতিহাসে চিরদিন শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাদের প্রতি দৌজড়ি পাড়ার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে রয়েছে অগাধ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং অন্তরের গভীর থেকে উৎসারিত কৃতজ্ঞতা।

আজ যখন কেউ দৌজড়ি পাড়া আদর্শ বৌদ্ধ বিহারে আসে, তখন সে শুধু একটি বিহার দেখে না। সে দেখে একজন মানুষের স্বপ্ন, ত্যাগ আর অদম্য সাধনার ইতিহাস। প্রতিটি মূর্তি, প্রতিটি ইট, প্রতিটি পথ যেন সেই গল্পই বলে—একজন মানুষ কীভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করে একটি গ্রামের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

 ধর্মপাল থের’র এই পথচলা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—মানুষ যদি সত্যিই নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে, তবে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে। দুঃখ, কষ্ট, অপমান—এসব সাময়িক। কিন্তু মানুষের জন্য করা কাজ চিরকাল বেঁচে থাকে।

 আজ দৌজড়ি পাড়া শুধু একটি গ্রাম নয়। এটি হয়ে উঠেছে ধর্ম, মানবতা ও ত্যাগের এক উজ্জ্বল পুণ্যভূমি। আর এই পুণ্যভূমির পেছনে যিনি নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি হলেন সেই ত্যাগী মানুষ—ধর্মপাল থের।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো আরও অনেক উন্নয়ন হবে, আরও অনেক মানুষ এখানে আসবে। কিন্তু ইতিহাসে চিরকাল লেখা থাকবে—এই পাহাড়ি জনপদে ধর্মের আলো জ্বালিয়েছিলেন একজন নিরলস সাধক, যার নাম ধর্মপাল থের

 

— লেখকঃ

ভদন্ত সুবর্ণ থের, অধ্যক্ষ- বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহার।  



 

0 comments:

Post a Comment