ভদন্ত সুবর্ণ থের’র ত্যাগ, সংগ্রাম ও মানবসেবার করুণ ত্যাগের বিনিময়ে আলো: পূর্ণজ্যোতি শিশু সদনের ইতিহাস
![]() |
| ভদন্ত সুবর্ণ থের |
মানবতার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন শুধু নিজের জন্য নয়—অন্যের জন্য উৎস্বর্গীত। যারা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে সমাজের অবহেলিত, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। তাঁদের জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ, ধৈর্য এবং মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকে। তেমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হলেন ভদন্ত সুবর্ণ থের।

ব্রিজিং জেনারেশনস এর মাধ্যমে শিশু সদনে শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ
খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষীছড়ি উপজেলার বাইন্যাছোলা এলাকার শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহার। এই বিহারের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ভদন্ত সুবর্ণ থের। একই সাথে তিনি পরিচালনা করছেন পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন অনাথ আশ্রম, যেখানে আশ্রয় পেয়েছে সমাজের অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের একটি বড় পরিবার।
ভদন্ত সুবর্ণ থের ২০১৩ সালে সন্ন্যাসী জীবন গ্রহণ করেন। সংসার জীবনের সব মোহ ত্যাগ করে তিনি বেছে নেন মানবসেবা ও ধর্মচর্চার পথ। তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে—মানুষের কল্যাণ, মানবতার সেবা এবং সমাজে নৈতিকতা ও সচেতনতার আলো ছড়িয়ে দেওয়া।

ভদন্ত সুবর্ণ থের’র উদ্যোগে বস্ত্র দান
সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি যখন বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে শুধুমাত্র ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করলেই সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন মানবিক কাজ, প্রয়োজন সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি সমাজসেবামূলক নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে শুরু করেন।

সভাপতি বিমলিতিষ্য মহাথের’ কে চিকিৎসা সহায়তা
২০১৪ সালে তিনি পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন অনাথ আশ্রমের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। আর্থিক সংকট, অব্যবস্থাপনা, অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। অনেকেই তখন মনে করেছিলেন, হয়তো এই প্রতিষ্ঠান আর টিকে থাকবে না। কিন্তু ভদন্ত সুবর্ণ থের হাল ছাড়েননি। তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষ যদি সত্যিকার অর্থে মানবতার সেবা করতে চায়, তবে কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারে না। তিনি সংকল্প করেন, যত কষ্টই হোক না কেন, এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি আবার দাঁড় করাবেন।

ভদন্ত সুবর্ণ ভিক্ষুর মাধ্যমে শিক্ষা সামগ্রী সহায়তা
সেই সময়টা ছিল ২০১৫ সাল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য—তখন এই অনাথ আশ্রমে একটি শিশুও ছিল না। ছিল না কোনো স্থায়ী অর্থের উৎস, ছিল না কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। চারদিকে হতাশা আর অনিশ্চয়তা। তবুও ভদন্ত সুবর্ণ থের থেমে থাকেননি। নিজের মেধা, পরিশ্রম, ধৈর্য এবং অসীম ত্যাগ দিয়ে তিনি শুরু করেন এক নতুন পথচলা। সমাজের বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসতে থাকেন অবহেলিত, এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। প্রথমে দুইজন, তারপর তিনজন, ধীরে ধীরে দশজন, তারপর বিশজন—এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে পূর্ণজ্যোতি শিশু সদনের নতুন পরিবার।
![]() |
| ভদন্ত সুবর্ন থের । ফাইল ছবি |
এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। এই পথ ছিল কষ্টের, ত্যাগের, সংগ্রামের। কখনো আর্থিক সংকট, কখনো সামাজিক বাধা, কখনো মানুষের ভুল বোঝাবুঝি—সবকিছুই তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় তিনি সামাজিক লাঞ্ছনা ও বঞ্চনারও শিকার হয়েছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, সমালোচনা করেছেন, সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভদন্ত সুবর্ণ থের কখনো নিরুৎসাহিত হননি। তিনি জানতেন—যে কাজ মানবতার জন্য, যে কাজ অসহায় মানুষের কল্যাণের জন্য, সেই কাজ কখনো বৃথা যায় না।
দিনের পর দিন, বছরের পর বছর তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ, আরাম-আয়েশ, এমনকি নিজের কষ্টের কথাও ভুলে গিয়ে তিনি নিবেদিত থেকেছেন শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কাজে।
আজ সেই একসময়কার প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন একটি আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই অনাথ আশ্রমে প্রায় ৬০ জন নিবাসী শিশু বসবাস করছে। তারা এখানে শুধু আশ্রয়ই পায় না—পায় শিক্ষা, ভালোবাসা, নিরাপত্তা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

ভদন্ত সুবর্ণ থের’র উদ্যোগে প্রিতিযোগিতার শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ
ভদন্ত সুবর্ণ থের শুধু আশ্রয় দেওয়ার মধ্যেই তাঁর দায়িত্ব শেষ মনে করেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, এই শিশুদের শিক্ষিত করে তোলাই তাদের জীবনের প্রকৃত পরিবর্তনের পথ। তাই তিনি তাদের পড়াশোনার জন্য বিনা খরচে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যবস্থা করেছেন।
বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে তিনজন টিউটর শিক্ষক নিয়মিত শিশুদের পড়াশোনা করান। এছাড়া রয়েছে একজন বাবুর্চি, যিনি প্রতিদিন শিশুদের জন্য খাবার প্রস্তুত করেন। এই সকল শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন ব্যবস্থাও ভদন্ত সুবর্ণ থের নিজেই বিভিন্ন উপায়ে সংগ্রহ করে থাকেন।
এই বিশাল দায়িত্ব পালন করা সহজ কোনো কাজ নয়। তবে তিনি একা নন। তাঁর এই মহৎ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ও দাতা। তাদের সহায়তা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই আজ এতগুলো শিশুর ভরণ-পোষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে।
ভদন্ত সুবর্ণ থের সবসময়ই তাঁদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন—এই মহান কাজটি আসলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। আজ যখন পূর্ণজ্যোতি শিশু সদনের শিশুদের হাসিমুখ দেখা যায়, তাদের স্বপ্ন দেখতে দেখা যায়, তখন মনে হয়—একজন মানুষের দৃঢ় সংকল্প কত বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে বিজয়ীদের নগদ অর্থ প্রদা
একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি ছিল প্রায় নিঃস্ব, আজ সেটিই হয়ে উঠেছে অনেক অসহায় শিশুর জীবনের আশ্রয়স্থল। এই সবকিছুর পেছনে রয়েছে এক মানুষের অসীম ত্যাগ, অদম্য সাহস এবং মানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা—আর তিনি হলেন ভদন্ত সুবর্ণ থের। তিনি শুধু একজন ধর্মীয় নেতা নন, তিনি একজন সমাজসেবক, একজন মানবতার সৈনিক। তিনি প্রমাণ করেছেন—মানবতার সেবা সবচেয়ে বড় ধর্ম।
ভদন্ত সুবর্ণ থের’র জীবন সংগ্রাম আমাদের শেখায়, যদি একজন মানুষ সত্যিকার অর্থে সমাজের জন্য কাজ করতে চায়, তবে সীমিত সম্পদ দিয়েও অসীম পরিবর্তন সম্ভব।
আজ পূর্ণজ্যোতি শিশু সদনের প্রতিটি শিশু তাঁর কাছে শুধু দায়িত্ব নয়—তারা তাঁর পরিবারের সদস্য। তাদের হাসি, তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের স্বপ্নই যেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। চোখের জলে গড়া এক আশ্রয়: ভদন্ত সুবর্ণ থেরের মানবসেবার সংগ্রামের এটিই আমার গল্প।
মানবতার জয় হোক- ভদন্ত সুবর্ণ থের




0 comments:
Post a Comment